কবি মিঠুন চক্রবর্তী


মিঠুন চক্রবর্তী

জন্ম:-- বাঁকুড়া জেলার ছাগুলিয়া নামের একটি ছোট্ট গাঁয়ে। ছেলেবেলা থেকেই কবিতার প্রতি আত্মিক টান।এখনও পর্যন্ত প্রকাশিত একক কাব্যগ্রন্থ:--যারা এখনও ভিজতে ভালবাসে,  যাপন কোলাজ, রাতের কমলা রঙের মেয়েগুলি, নীল প্রজাপতির উপত্যকা। এছাড়াও ' হাত রেখেছি চাঁদের গায়ে' এবং ' সম্পর্কগাছ ' নামের দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পথে। পশ্চিমমেদিনীপুরের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজে নিযুক্ত আছেন। 

গুচ্ছ কবিতায়                                                    কবি মিঠুন চক্রবর্তী









খাদক

যে ছেলেটি চলন্ত মালগাড়ি থেকে কয়লা চুরি করে
অন্ধকারে চুপিসাড়ে অদৃশ্য হওয়ার কৌশল শিখেছে,
যে মেয়েটি ইঁটভাটার আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে আলো 

বিকেলের এক প্রজাপতি
বেশ্যাপাড়ার গলি এবং রেলকলোনির বস্তি পেরিয়ে
ওদের কদমতলার মাঠে ডেকে পাঠাল

' নাও, দিলাম ছেঁড়া টায়ার - দোলনা বানাও, দোলনা...'

দোল... দোল... দোল... দিগন্ত যায় ছিঁড়ে
ওদের কালো গা 
গলে যাচ্ছে গড়িয়ে যাচ্ছে - 
                                             তীব্র সোনালী ঢেউ

এমন দৃশ্য হতেও পারত। কিন্তু মশাই হলেই হল ! 
আমরা যারা সিল্কের সোনালী রুমাল নিয়ে ম্যাজিক দেখাই,
আমরা যারা টবে টবে রং-বাহারি পুষ্প ফোটাই,
আমরা যারা ঘেন্না দিয়ে গুটিয়ে নিলাম কদমগাছের শিকড় সহ,
আমরা যারা সাদা জামায় পায়রা পুষি
ছাদের থেকে ওদের প্রতি ঢেলে দিলাম পিচের মত রাত্রি ।

এরপরই গল্পটা শুরু হল...

ওদের পেটের ভেতর থেকে তৃতীয় একটা বীভৎস হাত
সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে আমাদের শোবার ঘরে,
আমাদের পড়ার এবং খাবার টেবিলের দিকে -

কিংবা ধরো একটা আস্ত দেশের দিকে...

প্রথম দেখার পর

প্রথম দেখায় আমি তোমার প্রেমে পড়লাম
তুমি তোমার চোখের ভেতরে দেখালে কাজু বাদাম বনের রাস্তা
সেই থেকে অজস্র গ্রীষ্ম বর্ষা বসন্ত পেরিয়ে শুধু হাঁটছি....

ঠিক কবে হয়েছিল তোমার সংগে প্রথম দেখা ? 
সেই মূহুর্তে ঠিক কতটা ধারালো হয়ে পৃথিবীতে  ঝুঁকে পড়েছিল আলো ? 

আজকাল খাঁ খাঁ গ্রীষ্মের দুপুর গুলো বুনো বাইসনের মতো ছুটে আসে
শিকারীর মতো লড়াই করি, 
আহত ও ক্লান্ত কাঁধের উপর আদিম অভ্যাসে তুলে রাখি শিকার

হয়তো এমনই কোনো প্রাগৈতিহাসিক দিনে তোমার সংগে প্রথম দেখা, 
অরণ্যের সবুজ আলোয় 
তোমার লতা- পাতার পোশাক দিয়ে মুছিয়ে দিয়েছিলে আমার গভীর ক্ষত

কিংবা প্রবল বর্ষার বাঁধ ভাঙা বানে যখন ভেসে যায় আমার গৃহস্থালি রাত
তোমার কথা ভাবি, মনে হয় 
নিশ্চিত তোমার সংগে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল 
বিগত জন্মের কোনো সভ্যতার উঠোনে নীল নদীর সর্বনাশা চাহনি চোখে

আর সেই যে কবে, যেদিন সত্যি সত্যি বসন্ত এসেছিল আমাদের ক্যাম্পাসে
লাজুক জলফড়িং লজ্জার মাথা খেয়ে উড়ে এসে বসে পড়েছিল মেঘদূত ক্লাসে
সেদিন তোমার শরীরের পবিত্র গন্ধে  এক পৃথিবীর মহুয়া কুড়িয়েছি আমি

এক বছর নয়, এক জন্ম তোমার বিরহী যক্ষ হব বলে

নীল রঙটি

সদ্য জেগে ওঠা বাদামী ভোরে এই যে আমি হাঁটছি
এবং সূর্যের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছি শ্বাসমূল
এই আমি-র প্রাচীরত্ব না থাকলেও,
আমারই বুকের ভেতরে এক সুপ্রাচীন দীঘি আছে

যেখানে তুমি তোমার গতজন্মে স্নান করতে এসে
ভুল করে ফেলে গেছ ঢেউ ঢেউ চুলের নীল ক্লিপটি। 
সেই থেকে সারাদিনে হাজার বার ডুব দিয়ে 
ভাসতে চাইলেই সে, জলের গভীরে রেখে আসি তাকে

সকাল থেকেই এখানে দু'টি গৃহস্থালি রাজহাঁস বেড়াতে আসে,
পদ্মের সোনালী পরাগ রাঙানো গল্পের ছলে কেটে যায় বেলা।
দক্ষিণের গাঢ় অরণ্য ফুঁড়ে বিকেলের ধুলো উড়িয়ে ছুটে আসে 
তৃষ্ণার্ত বুনো মহিষের দল। 
                       আমি তো তখন অসহায় প্রেমিক কেবল। 

সারারাত অনিয়ন্ত্রিত  দীঘিটির টলমল জল জুড়ে ভেসে থাকে
আমার এই জন্মের একমাত্র সুখ এবং দুঃখ 
             তোমার গতজন্মে ফেলে যাওয়া সেই নীল রঙটি। 






Comments

Popular posts from this blog

কবি ঝিলম ত্রিবেদী

কবি অরূপ দত্ত

কবি সুধাংশু রঞ্জন সাহা