কবি মলয় রায়চৌধুরী
মলয় রায়চৌধুরী
জন্ম: অক্টোবর ২৯, ১৯৩৯। কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সাংবাদিক, গণবুদ্ধিজীবি এবং সর্বোপরি ১৯৬০-এর দশকের হাংরি আন্দোলন—হাংরিয়ালিজম—তথা বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জনক এবং এ কারণে ১৯৬০-এর দশক থেকেই ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে তিনি বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব।১৯৬৪ সালে "প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার" কবিতার জন্যে রাষ্ট্রবিরোধী মামলায় গ্রেফতার ও কারাবরণ করেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতের অধিক। তার ১০টি কাব্যগ্রন্থ, ১০টি উপন্যাস, দুটি ডিটেকটিভ উপন্যাস, একটি ইরটিক নভেলা, ১২টি সমালোচনা গ্রন্থ, চারটি জীবনী এবং বহু অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েঝে। উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে শয়তানের মুখ, জখম, ডুব জলে যেটুকু প্রশ্বাস, নামগন্ধ চিৎকার সমগ্র, কৌণপের লুচিমাংস, মাথা কেটে পাঠাচ্ছি যত্ন করে রেখো, বাউল-কবিতা সিরিজ ডোমনি, অ্যালেন গিন্সবার্গের হাউল ও ক্যাডিশ কাব্য- গ্রন্থের অনুবাদ প্রভৃতি অন্যতম। লোকনাথ ভট্টাচার্যের পর তিনি দ্বিতীয় বাঙালি যিনি জাঁ আর্তুর র্যাঁবো'র নরকে এক ঋতু এবং ইল্যুমুনেশান্স অনুবাদ করেছেন । বুদ্ধদেব বসুর পর প্রথম বাঙালি যিনি বোদলেয়ারের সমগ্র কবিতা অনুবাদ করেছেন । পেঙ্গুইন র্যাণ্ডাম হাউস থেকে তাঁকে নিয়ে 'দি হাংরিয়ালিস্টস নামে একটি গ্রন্হ প্রকাশিত হয়েছে, যা লিখেছেন মৈত্রেয়ী ভট্টাচার্য চৌধুরী । ২০০৩ সালে অনুবাদ সাহিত্যে তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
রাশিয়ার কবি আনা আখমাতোভা-র (Anna Akhmatova) কবিতার অনুবাদে কবি মলয় রায়চৌধুরী
আনা আখ্মাতোভা (Anna Akhmatova)
(১৮৮৯-১৯৬৬) একজন খ্যাতনামা রুশ কবি। তার আসল নাম আনা আন্দ্রেইয়েভ্না গোরেংকো। প্রায় অর্ধ শতাব্দী সময় জুড়ে তিনি রুশ কবিতার সেইন্ট পিটার্স্বার্গ ধারার প্রাণকেন্দ্র ছিলেন। তিনি স্বল্প দৈর্ঘ্যের কবিতা থেকে শুরু করে দীর্ঘ কবিতাচক্র পর্যন্ত লিখেছেন। তার কবিতার বিষয়বস্তু বিবিধ - সময়, স্মৃতি, সৃজনশীল নারীদের পরিণতি, এবং স্টালিনের ত্রাসের রাজত্বের মধ্যে বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
ক্লিওপেট্রা
( আমি বাতাস ও আগুন - শেকসপিয়ার )
অ্যান্টনির মরা ঠোঁটে আগেই ও খেয়েছিল চুমো
সিজারের পায়ে পড়ে হাঁটু গেঁযে নিয়েছিল কেঁদে
চাকরেরা বিশ্বাসঘাতক । মিইয়ে আসা গাঢ় অন্ধকারে
ওকে হেরে যেতে দেখে রোমের ইগলপাখি উল্লাসে
বাজাচ্ছে ভেঁপুভেরি ।
ওর কমনীয় রূপে বাঁধা শেষতম লোকটি ঘরে ঢোকে
ঋজু ও রাজকীয় । নিজেরি রানির সামনে তোতলায়:
“দাসি-গোলামের মতো হাঁটাবে তোমাকে রাজপথে, কেননা বিজয়ী !”
শুনেও ও শুয়ে থাকে, হাঁসের মতন গ্রীবা,শান্ত গরিমায়!
ভোর হলে শেকলে বাঁধবে ওর ছেলেমেয়েদের । সামান্য প্রেম
পৃথিবীতে রয়ে গেছে ওর :এও লোকটির সাথে রসিকতা।
তারপর ছেড়ে দেবে শেষ করুণার মতো বিষধর
শ্যামল বুকের মাঝে আলতো হাতে কালো জীবটাকে ।
মৃত্যুকে
জানি তুমি আসবেই । তাহলে এ প্রতীক্ষা কেন ?
তোমার জন্য আমি পথ চেয়ে : ফুরিয়ে গিয়েছে সব কাজ।
আশার দীপ্র আলো কবে নিভে গেছে।দরোজা রেখেছি খুলে
তোমার নামের এক সরল বিস্ময় আসবে তেমন আশায়।
অতএব যা-আদল নিতে চাও, নাও : ছুঁড়ে মারো
তোমার বিষাক্ত বোমা আমার বাসাকে লক্ষ্য করে,
কিংবা পেশাদার খুনি-গুণ্ডার লাঠির ঘায়ে মেরে ফ্যালো,
কিংবা কন্ঠে ঠেশে দাও তান্ত্রিক-জ্বরের বিষ-ধোঁয়া,
যদি তুমি তাই চাও, ঘুম পাড়াবার গল্প হয়ে
অসংখ্য নিরপরাধ যেভাবে তোমায় চেনে, এসো :
গুপ্ত পুলিশের নীল টুপিখানা দেখাও আমাকে । ভয়ে কাঠ
মুখে রক্ত উবে-যাওয়া কাজের লোকের হাত কাঁপে ;
আমার পরোয়া নেই । এনিস নদীর স্রোত বয়ে যায়,
মাথার ওপরে জ্বলে উত্তরের তারা
আর প্রিয় চোখ জুড়ে পুরোনো নীলাভ আলো
শেষতম আতঙ্কের জন্য যশোহীন ।
আমার কেউ নয় ওরা যারা দেশ ছেড়ে চলে যায়
আমার কেউ নয় ওরা যারা দেশ ছেড়ে চলে যায়
শত্রু আর লুটেরার হাতে যায় দেশটাকে ছেড়ে ।
ওদের প্রথাগত প্রশংসায় আমি কান দিই না খকনও ।
ওরা সব গাইবে বলে আমার কোনো গান নেই ।
দেশত্যাগীদের জন্য আমি কষ্ট পাবো চিরকাল।
কয়েদির মতো কিংবা যেন আধমরা,
যে পথে তোমরা ঘোরো অন্ধকারে, ভবঘুরে দল,
তোমার বিদেশি অন্নে তেতোপাতা ভরা।
এখানে স্বদেশে রোজ অগ্নিকাণ্ড ঘটেই চলেছে
খেয়ে ফেলছে বাকি যৌবন, আমরা এগোই
আমাদের থ্যাঁতলানো দেহ কোনো পরোয়া করেনি
একটি আঘাতকেও দেয়নি থামিয়ে ।
জানি পরে কোনোদিন চেতনার আগমন হবে
প্রতিটি মুহূর্তের ব্যথাকে তা ন্যায্যতা দেবে।
আমরা সবাই এ-জগতের কান্নাহীন লোক ।
গর্বে বুক ভরে যায় আমাদের । আমরা সাধারণ ।


Comments
Post a Comment