কবি রফিক উল ইসলাম


রফিক উল ইসলাম

জন্ম: আগস্ট ১৯৫৪। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ।প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: জলের মতো সুখে আছি(১৯৮৫), শব আর শব্দ ভৈরবী(১৯৮৯), মৈত্রেয় রাত্রির পথে(১৯৯৩), আমাদের বৃষ্টিপাতের মাঝখানে(১৯৯৭), সোনালি শিবির(২০০১), প্লাবনরেখা ছুঁয়ে(২০০১), ভিন গাঁয়ের কথাটি(২০০৫), জিয়ারত(২০০৯), অর্ধেক চাঁদের জন্যে(২০১২), আটাশ কিংবা ছাব্বিশ(২০১৪), The Magic Bridge (2014, 2nd edition ), শ্রেষ্ঠ কবিতা(২০১৫), অবসরের পর সেলফি(২০১৮), কবিতাসংগ্রহ(২০১৮/বাংলাদেশ থেকে)।ছোটোদের কবিতা: হাওয়ার কানে মেঘের দুল(২০১১)।বিশিষ্ট এই কবি ও গবেষকের ২০ টিরও অধিক গবেষণা ও সংকলনগ্রন্থ প্রকশিত হয়েছে। দেশ-বিদেশের  ১০০ টিরও অধিক সংকলনগ্রন্থে মুদ্রিত হয়েছে তাঁর কবিতা।সম্পাদিত পত্রিকা: গ্রামনগর (এখন বন্ধ)

@সম্পাদকের জানালা
এ সংখ্যার জন্য মনোনীত সম্পাদক হলেন 'গ্রামনগর' পত্রিকার সম্পাদক কবি রফিক উল ইসলাম


সীসার অক্ষরে, ফিনিক্স-ডানার 'গ্রামনগর'

প্রকৃত অর্থে, সে ছিল এক ঘোর উন্মাদকাল! অদৃশ্য কোনো ঝড়ে খড়কুটোর মতন হঠাৎ উড়ে এসে বুকের ভেতর লেপটে গেল 'সেই বালিকা'! তাকে প্রাণপণ জড়িয়ে, আর প্রবল বর্ষণে ভিজতে ভিজতে জ্বর এসেছিল খুব। বর্ষণ আর সেই প্রাক-কিশোরী কখনো যেন জাগরিত হয়ে থাকে, কখনো আবার অদৃশ্যও হয় হাত-ধরাধরি করে। কিন্তু পরিত্রাণহীন সেই জ্বর নিয়তই তাড়িয়ে বেড়াতে থাকল দশ দিগন্তে, দিগন্ত ভেঙেচুরে নতুনতর দিগন্ত নির্মাণে প্ররোচিত করে তুলল। 'দেশ' পত্রিকায় ছাপাও হল সেই জারিত অনুভব: '.... ওই বালিকা বনের পথে অধীর হল। / তার ত্বক থেকে সাদা ঝরছিল / স্পর্শ করলাম প্রথমবার। / তার কণ্ঠহারে ঢেউ উঠেছিল। / ডুবে যেতে চাইলাম। / তার শরীর একসময় জোনাকির আলো হয়ে গেল।....'
           
আধো-অন্ধকার, আর এইসব জোনাকিদের লীলাচঞ্চল উস্কানিতে কেটেই যাচ্ছিল দিনগুলি। হঠাৎ-ই মনে হতে থাকল, নিজেদের, অর্থাৎ সমমনস্ক, স্পন্দিত আর নিভৃত চর্চাকারীদের আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্যে একটি যথার্থ ভূমি তৈরি করে নেওয়া দরকার। শহরকেন্দ্রিক নামী কবিদের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে সুদূর জেলাগুলিতে নির্জনে চর্চারত কবিদের কণ্ঠস্বর যুক্ত করে একটি সম্মিলিত ধ্বনিরূপ নির্মাণে সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এইসব ভাবনারই 

ফলশ্রুতিতে 'গ্রামনগর' পত্রিকাটির আত্মপ্রকাশ ১৯৮৫-তে। অগঠিত হৃদয়ের উন্মাদনায় জন্ম হলেও, একে একে কবি সুব্রত রুদ্র, কবি সুধীর দত্ত, কবি ও বরেণ্য চিত্রশিল্পী পূর্ণেন্দু পত্রীও তাঁদের সবটুকু অন্তঃকরণ যুক্ত করেছিলেন পত্রিকাটির সঙ্গে। বারংবার তাঁদের গদ্যে-পদ্যে, অলংকরণ আর উপদেশেও সমৃদ্ধ হয়েছে 'গ্রামনগর'।
            
 'গ্রামনগর'-এর লেখকসূচি ঈর্ষণীয়। বাংলা ভাষার প্রায় সব প্রধান কবি-ই কোনো-না-কোনো সংখ্যায় কলম ধরেছেন পত্রিকাটির জন্যে, যেখানে সমভাবে তাঁদের লেখনী যুক্ত করেছিলেন

 বাংলাদেশের কবিরাও। সে তো এক রোমহর্ষক সময়কাল! বর্তমান বিশ্বের যোগাযোগের মাধ্যমগুলির বিন্দুমাত্র সুযোগ-সুবিধা ছিলনা তখন, পুরোটাই ডাক-ব্যবস্থা নির্ভর, এমনকি ছিল না দূরভাষের সুবিধাও! ডায়মন্ড হারবার থেকে চিঠি পাঠানোর পর, ঢাকা কিংবা বরিশালের কোনো কবির লেখা আদৌ পাব কিনা, এটুকু বুঝে উঠতেই কমপক্ষে ৩০/৩৫ দিনের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায় থাকা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না! ফলে, কবি সুব্রত রুদ্র-র নির্দেশেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল বছরে একটি বা দুটি সংখ্যা প্রকাশের। ১৯৯৮ পর্যন্ত, ১৪ বছরে, মোট ২০টি সংখ্যা প্রকাশ পেয়েছিল 'গ্রামনগর'-এর।
             
ঘুপচি ঘরের লেটার-প্রেসে, টিমটিমে বাল্বের আলোয় সীসার অক্ষর একটি একটি করে জুড়ে কম্পোজ হত নির্বাচিত রচনাগুলি। দু-তিনবার ভিজে কাগজের ওপর গালি-প্রুফ সংশোধনের পর, ছাপা হত পা-য়ে চালানো মুদ্রণযন্ত্রে। ধৈর্যের চরম পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত হওয়ারও উপায় থাকতো না। মনে পড়ে, বাড়ি ফেরার শেষ অবলম্বনটুকুও হাতছাড়া হওয়ার পর, ঝাঁপ-বন্ধ প্রেসের সামনে আড্ডা দিতে দিতে, গভীর রাতে পুলিশের খপ্পরে পড়া! এরকম দুঃসহ স্মৃতির পাশাপাশি মনের কোণ আলোকিত করেই আছে মূল্যবান অনেক স্মৃতিও। যেমন, 'দেশ' পত্রিকার অফিস থেকে দু-বার ফিরে এসেছি সুনীলদা (গঙ্গোপাধ্যায়) লেখা দিতে পারেননি, বলেছেন: 'সামনের সপ্তায় এসো...'। সেই সপ্তাহে গিয়েও দেখি, কবিতা লিখে উঠতে পারেননি 'গ্রামনগর'-এর জন্যে। এত দূর থেকে গিয়ে, বিমর্ষ মুখে, ফিরে আসার জন্যে যেইমাত্র উঠে দাঁড়িয়েছি, সুনীলদা বললেন: 'বোসো'। বসলাম আমি। পাশের টেবিলে বসা জয় গোস্বামীকে ডেকে বললেন: ' জয়, দেশ-এর ফাইল থেকে আমার কবিতাটি বের করে রফিককে দাও তো, আমি কালকে তোমায় নতুন কবিতা দিয়ে দেব...!' বিস্ময়ে অভিভূত আমি। এমন দরাজ মনের মানুষ জীবনে খুব কমই দেখেছি আমি। 'গ্রামনগর' বহুবার সমৃদ্ধ হয়েছে তাঁর নতুন নতুন কবিতায়।
            
মোটামুটি ছাপা হত ৩০০/৩৫০ কপি, আলোচনা সংখ্যাটি বোধহয় ছাপা হয়েছিল ৪০০ কপি। এটুকু করতেই হিমসিম অবস্থা হত টাকা সংকুলানের। কয়েকজন হৃদয়বান সংস্কৃতি-প্রেমীর প্রাণপণ সহযোগিতা আর সামান্য কিছু বিজ্ঞাপনে কুলিয়ে উঠতে হত আমাদের। এঁদের মধ্যে ডাঃ অরুণ বসু, আর কবি দীপক হালদারের কথা চিরজীবন মনে থাকবে আমার। বিদেশী কবিতার অনুবাদে সিদ্ধহস্ত ছিলেন ডাঃ বসু। কিন্তু পত্রিকা প্রস্তুত হয়ে যাওয়ার পর, সবচেয়ে দুরূহতম কাজটি ছিল পত্রিকার কপি লেখক-কবিদের কাছে পৌঁছানো। ডাকখরচ করার তেমন সামর্থ ছিলনা আমাদের, হয়তো কলকাতা ঘুরে ঘুরে কিছু কপি বিলি করা গেল, এটুকুই। তারপর অপেক্ষা করতে হত ২৫ বৈশাখের জন্যে। ওই দিন ভোর থেকেই কলকাতার রবীন্দ্র সদন চত্বর বিভিন্ন ছোট পত্রিকার স্টল আর অজস্র কবিদের ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠতো। 'গ্রামনগর'ও যোগ দিত সেখানে। 'গ্রামনগর' থেকেই ১৯৯৩ থেকে ২০০০ পর্যন্ত প্রতি বছর ২৫ বৈশাখের ভোরে প্রকাশিত হত 'এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ' বিশেষ ট্যাবলয়েডটি। আমাদের স্টলে যুক্ত হত ওটিও।
           
শুধুমাত্র পত্রিকা প্রকাশেই মন থেমে থাকতে চাইল না একসময়। 'গ্রামনগর' থেকে কবি সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত কবিতার বিশেষ বিশেষ সংকলনগ্রন্থ যেমন প্রকাশিত হয়েছিল, ঠিক তেমনই প্রকাশ পেয়েছিল কবি আলোক সরকারের 'তমোশঙ্খ', সামসুল হকের 'ত্রসরেণু', সুধীর দত্তের 'প্রাকপুরাণ', দীপক হালদারের 'হে অনঙ্গ উত্তরীয়', অরুণ পাঠকের 'প্রশস্তির ভিন্ন রূপ' ইত্যাদি উজ্জ্বল কবিতাগ্রন্থগুলিও। এমনকি 'গ্রামনগর' থেকেই তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করতে চেয়ে স্বনামধন্য কবি ও চিত্রশিল্পী পূর্ণেন্দু পত্রী ২২.০২.১৯৯৬-তে একটি পত্র লিখেছিলেন আমাকে, পাণ্ডুলিপিও তুলে দিয়েছিলেন আমার হাতে। সে এক অন্য রোমাঞ্চকর ইতিহাস!
              
বিস্তৃত সময়ের অন্ধকার, আর পত্রিকার অ-সংরক্ষিত সংখ্যাগুলির ধুলোমলিন আস্তরণ সরিয়ে বাংলা সাহিত্যের উদ্যমী গবেষক লিটন রাকিব এবং তরুণ প্রজন্মের কবি আরফিনা অক্লান্ত পরিশ্রম আর যত্ন
 করে 'গ্রামনগর'-এর একটি নির্বাচিত সংকলনগ্রন্থ (নির্বাচিত গ্রামনগর) প্রস্তুত করেছেন, যেটি 'আবিষ্কার' প্রকাশনী (M: 9830331092) থেকে প্রকাশিত হয়েছে জানুয়ারি ২০২০-তে। এই প্রকাশনার ক্ষেত্রে বিশেষ সহযোগিতা করেছেন কথাসাহিত্যিক মুর্শিদ এ এম। এঁদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফিনিক্স-ডানায় আবারও সাম্প্রতিক আলোয় কিছুটা ফিরে এসেছে হারিয়ে যাওয়া 'গ্রামনগর'। আমার চিরজীবনের কৃতজ্ঞতা এঁদের প্রতি। ছোট একটি পত্রিকার নিরন্তর সংগ্রাম, তার অবদান  কিংবা বৈশিষ্ট্যের কিছুটা আভাস দেওয়ার জন্যে, 'নির্বাচিত গ্রামনগর'-এর লেখক-সূচি এখানে যুক্ত করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি।


























Comments

Popular posts from this blog

কবি ঝিলম ত্রিবেদী

কবি মলয় রায়চৌধুরী