কবি-প্রাবন্ধিক মুহম্মদ মতিউল্লাহ
মুহম্মদ মতিউল্লাহ
জন্ম:- ৯জুলাই, ১৯৬৭।অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের বিশেষ স্নেহধন্য।বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকেএম এ, এমফিল, ডক্টরেট।নব্বইয়ের দশকের কবি ও প্রাবন্ধিক।প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:- অন্নজলে ভালোবাসায়; শোনো জন্মান্ধ যুবক; আপাতত হোস্টেলে আছি; ও পলাশ,ও করবী;ঈশ্বরের পত্রাবলী ঘিরে নম্র ধূসরতা; হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ; নির্বাচিত কবিতা; নৈশপ্রহরীদের খেলাধুলা প্রভৃতি।প্রবন্ধওসম্পাদিত গ্রন্থ নয়টি।সম্পাদনা করেছেন 'বুদ্ধদেব বসুর পত্রগুচ্ছ', 'অগ্রন্থিত রবীন্দ্র পত্রাবলী।সাহিত্য পুরস্কার:-তুষার চট্টোপাধ্যায় সম্মান,কবিতা পাক্ষিক সম্মাননা,ইসক্রা সাহিত্য সম্মাননা,বার্ণিক সাহিত্য সম্মান ইত্যাদি।ইংরেজি ও নানা ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর প্রবন্ধ ও কবিতা।
@ঐতিহ্যের আলোকে.....
বাংলা কাব্য আন্দোলনের নতুন ধারার সার্থক প্রতিভু হল 'শতভিষা'
পঞ্চাশের দশকের কবিদের মুখপাত্র হিসাবে 'শতভিষা' প্রকাশিত হয় হাজার ১৯৫১ সালে। আলোক সরকার ও দীপংকর দাসগুপ্তের যৌথ সম্পাদনায়। এঁদের সঙ্গে ছিলেন তরুণ মিত্র। সম্পাদকের নাম পত্রিকায় ছাপা হতো না। প্রকাশক হিসেবে দীপংকর দাসগুপ্তের নাম ছাপা হতো। বুদ্ধদেব বসুর 'কবিতা'(১৯৩৫)আর শুদ্ধসত্ত্ব বসু সম্পাদিত একক(১৯৪১)। পরবর্তীকালে ষোলো পৃষ্ঠার স্বল্প কলেবরের 'শতভিষা' প্রকাশের পরই আরো বেশ কয়েকটি কবিতা পত্রিকা প্রকাশের উৎসাহ বাড়ে। এর দু'বছরের মধ্যে প্রকাশিত হয় 'কৃত্তিবাস'।
'শতভিষা' সম্পর্কে পরবর্তীকালে আলোক সরকার লেখেন,
"বুদ্ধদেব বসু-র 'কবিতা' সেই ধরনের কবিতা বিষয়েই পক্ষপাত প্রমাণ করতো যা ত্রিশের দশকের কবিদের প্রতিধ্বনি,নতুন কোন কাব্য আন্দোলন শুরু হতে পারে এমন ধারণা 'কবিতা' পত্রিকার ছিল না। এ অবস্থায় 'শতভিষা' যা আধুনিকতাকে প্রবাহমানতা অর্থেই একদিক থেকে গ্রহণ করেছিল, তার প্রকাশ যে বিশেষ প্রয়োজন ছিল সেটা বুঝতে পারা যায়।" ('শতভিষা', রজতজয়ন্তী সংখ্যা ১৩৮৬)।'শতভিষা'-র প্রথম সংখ্যায় তরুণ কবিদের পাশাপাশি প্রবীণ কবিদের কবিতা, বিদেশি কবিতার অনুবাদ ছাপা হয়। পত্রিকা শেষে যুক্ত ছিল 'পূর্বরঙ্গ' নামে সম্পাদকীয় গদ্য।শতভিষা'-র স্বপক্ষে এটি লেখেন দীপংকর দাসগুপ্ত। সেখানে ঘোষিত হয় 'রসোত্তীর্ণ' কবিতাকেই তারা মর্যাদা দিতে চান,তার বিষয়বস্তু চাঁদ,ফুল,পাখি কিংবা 'মিছিল-ধর্মঘট' যা-ই হোক । কেন এই কথাগুলি সেদিন 'শতভিষা'-কে বলতে হয়েছিল এর উত্তরের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে শতভিষা'-র সময়কালের প্রেক্ষিতটি নিহিত। এক সাক্ষাৎকারে দীপংকর দাসগুপ্ত জানান, "এটা বলেছিলাম এই জন্য যে তখন 'অগ্রণী','পরিচয়' ইত্যাদি যেসব কাগজ ছিল তারা 'বিপ্লবী কবিতা চাই', জনগণের কবিতা চাই' ইত্যাদি সব বলতো। তাতে কোনো আপত্তির কারণ নেই, কিন্তু সেটা লিখতে হবে এবং একমাত্র সেটাই লিখতে হবে--- আপত্তি এইখানে।" (কথা, মাঘ ১৪০০)।এ বক্তব্য-বিষয়টি আলোক সরকার আরো স্পষ্ট করে একটি সাক্ষাৎকারে, "সেই সময় তথাকথিত বামপন্থী কবিতার একটা আন্দোলন চলছিল। সেই সময় অনেকেই ওই ধরনের কবিতা লিখতে আগ্রহ প্রকাশ করতেন। আমরা কখনো এটা ভাবতাম না যে, এই রকম কবিতা লিখলে তিনি খুব খারাপ কবি। তবে এরকম যে লিখতে হবে এরকম কোন শর্ত গ্রহণ করতে আমরা রাজি ছিলাম না" এবং তখনই আলোক সরকারদের মনে হয়েছে 'আমরা কবিতাকে আবার কবিতার কাছে ফিরিয়ে আনবো'। কবিতাকে বহির্জাগতিক কোলাহল থেকে অন্তর্মুখীনতার দিকে, শুদ্ধতার দিকে নিয়ে আসাটাই ছিল 'শতভিষা' আত্মপ্রকাশের প্রধান উপলক্ষ।
'শতভিষা' প্রকাশের প্রথম পরিকল্পনা নেন আলোক সরকার এবং দীপংকর দাশগুপ্ত একটি ছোট্ট চায়ের দোকানের আড্ডায়।পরে পরিকল্পনা সঞ্চারিত হয় আলফা কাফেতে। সেখানে আড্ডা দিতেন সমকালের বিভিন্ন পেশার মানুষেরা। শুরু থেকে 'শতভিষা'-র সঙ্গে যাঁরা ছিলেন, প্রায় সকলেই আলফা কাফের সদস্য। আলোক সরকার তখন সদ্য বি. এ.পাস করা বেকার যুবক, দীপংকর দাসগুপ্ত দৈনিক 'গণবার্তা'র শিক্ষানবিশ সাংবাদিক, মাসিক দশ টাকা হাতখরচ পান। এঁদের সঙ্গে আলফা কাফেতে আড্ডায় বসেন তরুন মিত্র, শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, অজিত বক্সী, অশেষ চট্টোপাধ্যায়, বিমল রায়চৌধুরী, সত্যেন্দ্র আচার্য, নন্দলাল ভট্টাচার্য প্রমুখ। আলোক সরকার লিখেছেন, 'দীপংকরের মাসিক দশ টাকা আছে, আমার পোস্ট অফিসে দশ টাকার একাউন্ট ছিল। তার থেকে পাঁচ টাকা তোলা গেল, তরুন মিত্র দিল তিন টাকা, রনজিৎ সেন তিন টাকা--- ২৪ টাকা দিয়ে কাজ শুরু হলো।"
দীপংকর দাসগুপ্ত সংগ্রহ করে আনেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের
কবিতা। অরুণকুমার সরকারের খাতা থেকে কবিতা চুরি করেন আলোক সরকার। তরুন মিত্র, অশোক মুখোপাধ্যায়ের মাস্টারমশাই' নরেশ গুহর কবিতা পাওয়া গেল। কবিতা নেওয়া হলো অরবিন্দ গুহ-র কাছ থেকে। অরবিন্দ গুহ তখনই বিখ্যাত তরুণ কবি। মৃনালকান্তি তখনও পরমানন্দ সরস্বতী হননি। তার কবিতা সংগ্রহ করা হল। মানস রায়চৌধুরী, কল্যাণ সেনগুপ্ত, পূর্ণেন্দুবিকাশ ভট্টাচার্য, শঙ্কর চট্টোপাধ্যায় প্রমুখদের কবিতা নেওয়া হল। মানস রায়চৌধুরী তখন স্কুলের ছাত্র।১৯৫১-র সেপ্টেম্বর 'শতভিষা'-র প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হলো 'শারদীয় সংকলন' ১৩৫৮ হিসেবে। মূল্য ছয় আনা।কভারে 'প্রেস থেকে ধার করা ব্লকের ছবি' সূচিপত্র নেই,পৃষ্ঠা সংখ্যার উল্লেখ নেই।অ্যান্টিক কাগজে ছাপা ছোট এক ফর্মার পত্রিকা। বিজ্ঞাপনহীন। সম্পাদকের নাম অনুল্লেখিত। প্রকাশক দীপংকর দাসগুপ্ত। প্রকাশস্থান:-১এ বিজয় মুখার্জি রোড, কলকাতা-২৬।মুদ্রক হালদার পাড়া রোড, কলকাতা-২৬। প্রথম সংখ্যায় ছাপা হয় বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'দুটি কবিতা'। তার পাশাপাশি তরুণ কবি অরবিন্দ গুহ, কল্যাণ সেনগুপ্ত, আলোক সরকারের কবিতা। ওঁরাও এবং সাঁওতালি কবিতা অবলম্বনে 'লোকগীতিকা' নামের কবিতা লেখেন মানস রায়চৌধুরী।
তরুন মিত্রের অনুবাদে ইয়েটস-এর 'The Lover Tells of the Rose in His heart 'প্রকাশিত হয়। সবশেষে 'পূর্বরঙ্গ' নামে সম্পাদকীয় গদ্য। প্রথম সংখ্যা প্রকাশের তিন মাস পর দ্বিতীয় সংখ্যা ১৩৫৮ সালে প্রকাশিত হয়। প্রথম সংখ্যার কবিদের পাশাপাশি আরো নতুন কবিরা এলেন। তাঁরা হলেন বটকৃষ্ণ দে, সত্যেন্দ্র আচার্য কবিতা সিংহ প্রমুখ। প্রথম সংখ্যার ঘোষিত লেখার বিষয়বস্তু, পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যাগুলিতে সাধারণভাবে অপরিবর্তিত থাকে। নবীন-প্রবীণের কবিতা, অনুবাদ কবিতা, কবিতা বিষয়ক গদ্য। ক্ষীণ কলেবর বৈশিষ্ট্য-উজ্জ্বল 'শতভিষা'র প্রকাশ সম্পর্কে 'কৃত্তিবাস'(১৩৬৪,বৈশাখ)-এ লেখা হয় সাম্প্রতিক কালের কবিদের বিশেষ অন্তরঙ্গ পত্রিকা শতভিষা। এই অনতি প্রচারিত জাঁকজমকহীন পত্রিকাটিতে কোন বিজ্ঞাপন গ্রহণ করার রীতি নেই। পৃষ্ঠাসংখ্যা মুদ্রিত থাকে না, অধিকাংশ সংখ্যাতেই প্রবন্ধের স্থান সংকুলান হয় না, শুধু কবিতা এবং পুস্তক সমালোচনা। শতভিষা'ই সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র পত্রিকা,যা পাঠক বা ক্রেতার মুখাপেক্ষী নয়। শতভিষা শুধু কবিদের পত্রিকা।'
তিনজন শতভিষা'-র সম্পাদনার কাজ দেখতেন। আলোক সরকার, দীপংকর দাশগুপ্ত এবং তরুণ মিত্র।আলোক সরকার শুদ্ধ কবিতায় আগ্রহী, অতিরিক্ত মননশীল এবং অন্তর্মুখী। দীপঙ্কর চিরদিন কট্টর আধুনিক কিন্তু সেই আধুনিকতা কোন উন্মত্ততা নয় যুক্তিবহ শৃংখলাবদ্ধ ক্রমঅগ্রসরমানতা, নির্বোধ অশিক্ষিত ভেঙেচুরে দেয়ার প্রয়াস নয়'-- লিখেছেন আলোক সরকার। তরুন মিত্র ছিলেন বিদেশি সাহিত্যের নিবিষ্ট পাঠক। শতভিষা'-র পাতায় তাঁর অনুবাদ কবিতা, বিদেশি সাহিত্য পর্যালোচনায় তাঁর পরিচয় ছড়িয়ে আছে। অন্য সম্পাদকদেরকে এ বিষয়ে সব সময় তিনি ওয়াকিবহাল রাখতেন।
পঞ্চাশের কবিরা, পরবর্তীতে যারা প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন, তাঁদের প্রায় সকলেই শতভিষা-য় আত্মপ্রকাশ করেন । শতভিষা-র তৃতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয় আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত-এর কবিতা। এরপর থেকে 'শতভিষা'-র পাতায় আলোকরঞ্জনের অবিরল আত্মপ্রকাশ। আলোক সরকার লিখেছেন, 'একবার একটি কবিতায় আলোকরঞ্জন 'বাঁশি' বানানে দীর্ঘ-ঈ-কারের ব্যবহার করেছিলেন, ছাপানোর সময় দীপঙ্কর হ্রস্ব-'ই'-কার করে ছাপেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে খুব সাময়িক একটা মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। অলোকরঞ্জন শতভিষা-য় নিয়মিত লিখলেও আলোক সরকার কিংবা দীপংকর দাসগুপ্তের সঙ্গে মুখোমুখি পরিচয় ১৯৫৩-র শেষের দিকে। এরপর থেকে অলোকরঞ্জন দাসগুপ্ত 'শতভিষা'-র একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। 'শতভিষা'-র দুটি সংখ্যা (চতুর্বিংশ, বৈশাখ ১৩৬৬ এবং অষ্টবিংশ, ফাল্গুন ১৩৬৮) সম্পাদনাও করেন অলোকরঞ্জন। একই সময়ে 'শতভিষা'-র ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত।১৯৫৪ থেকে প্রণবেন্দু 'শতভিষা'-র নিয়মিত লেখক ছিলেন। ১৯৫৪-১৯৫৮ অবধি শতভিষা-কে ঘিরে ছিলেন অলোকরঞ্জন দাসগুপ্ত, প্রণবেন্দু দাসগুপ্ত, তরুন মিত্র, দীপংকর দাসগুপ্ত, আলোক সরকার। শতভিষা'-য় প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের প্রথম কবিতা ছাপা হয় ১১ সংখ্যক শারদীয়ার ১৩৬১ সংখ্যায়। কবিতার নাম 'প্রতিশ্রুতি'। কবিতার একটি লাইনে 'কাম' শব্দটি ছাপার ভুলে 'কাজ' হয়ে যায়। যেহেতু তখন সবার ধারণা 'শতভিষা' ইন্দ্রিয়- উত্তেজক কবিতার বিরোধী, তাই প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের ধারণা হয় এই শব্দ বদল যেন ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে। কিন্তু আলোক সরকার পরবর্তীকালে জানান 'ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত, কোনো ভিত্তি নেই।'
১৯৫৬ থেকে শতভিষা-য় সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত লিখতে শুরু করেন, আর ১৯৫৭-তে তারাপদ রায়। তারাপদ রায় সে সময় 'শতভিষা' এবং 'কৃত্তিবাস' দুটোতেই নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটি মজার ঘটনা উল্লেখ করে 'কৃত্তিবাস'-এ লেখেন 'দুটি পত্রিকার (শতভিষা, কৃত্তিবাস) সঙ্গেই ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত তারাপদ রায়। তাঁর বিবাহের পর স্ত্রী যখন সন্তানসম্ভবা হন, সেই সময়েই তিনি ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে, তাঁর কন্যা জন্মালে নাম রাখা হবে 'শতভিষা' এবং পুত্র জন্মালে 'কৃত্তিবাস'। (কৃত্তিবাস, অক্টোবর-নভেম্বর, ১৯৭৬)। দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুধেন্দু মল্লিক, উৎপল কুমার বসু, কবিতা সিংহ, প্রণব কুমার মুখোপাধ্যায় প্রমুখেরা ছিলেন 'শতভিষা'-র নিয়মিত লেখক। তুলনায় কম লেখা ছাপা হয়েছে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের। বিনয় মজুমদার শেষের দিকে নিয়মিত লিখেছেন। ষাটের দশকের সামসুল হক, পবিত্র মুখোপাধ্যায়, মৃণাল দত্ত, রত্নেশ্বর হাজরা, কালীকৃষ্ণ গুহ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, পুষ্কর দাশগুপ্ত, সুব্রত রুদ্র, রাণা চট্টোপাধ্যায়, পরেশ মন্ডল প্রমুখ কবিরাও নিয়মিত। শতভিষা'-র ষষ্ঠ সংকলন শীত-বসন্ত
১৩৫৯ সংখ্যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম কবিতা ছাপা হয় নাম 'ঝর্নাকে'। পরবর্তী সময়ে আলোক সরকার একটি স্মৃতিচারণায় লিখেছেন " ১৯৫২ সালের শেষদিকে শতভিষা-র পঞ্চম সংকলন প্রকাশের আগে আমরা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নামের একজন কবির কবিতা পাই। তাঁর নাম আগে কখনো শুনিনি; কিন্তু কবিতা পড়ে দীপঙ্করের উচ্ছাস দেখেছি।" কিন্তু শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেনি। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম প্রেরিত কবিতা পছন্দ হয়নি দীপঙ্কর দাসগুপ্তের,ছাপাতেও কুন্ঠা। কিন্তু আলোক সরকার আবার শক্তির কবিতার পক্ষে। 'শতভিষা'-য় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম আত্মপ্রকাশ ষোড়শ সংকলন বসন্ত ১৩৬২ সংখ্যায়। কবিতার নাম 'যুবরাজ'। 'শতভিষা'-য় শঙ্খ ঘোষের প্রথম লেখা ছাপা হয় ১৩৬৬-র ২৪ তম সংখ্যায়। কবিতার নাম 'ঘর'। শতভিষা-র সম্পাদকের স্বীকারোক্তি, "আমরা তাঁর কবিতা পেতে চাই, কিন্তু তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ছিল না। তার ঠিকানা সংগ্রহ করতে করতেই শতভিষা অনেকগুলি সংখ্যা প্রকাশিত হয়ে গেল।"শতভিষা'-য় জীবনানন্দ দাশের প্রথম লেখা পাওয়া যায় চতুর্থ সংখ্যায়,শরৎ১৩৫৯-এ। কবিতার নাম 'রশ্মি এসে পড়ে'। এরপর থেকেই কবির বেশ কয়েকটি লেখা 'শতভিষা'-য় পাওয়া যায়। জীবনানন্দের জীবদ্দশায় কবির শেষ প্রকাশিত কবিতা ছাপা হয় শতভিষা-র ১১ নম্বর সংকলনে, কার্তিকের ভোরে: ১৩৪৫ নামে। বুদ্ধদেব বসু-র 'কবিতা' পত্রিকায় পরে কবিতাটি পুনর্মুদ্রিত হয় অন্যান্য আটটি কবিতার সঙ্গে। (দ্রষ্টব্য 'কবিতা'১৩৬১,)।জীবনানন্দ দাশের প্রথম কবিতা সংগ্রহের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আলোক সরকার, "জীবনানন্দের বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে যেতে একদিন সাহস করে এগিয়ে যাওয়া গেল। সরু গলি দিয়ে ঢুকে দরজায় কড়া নাড়তে বেরিয়ে এসে এলেন উঁচু করে কাপড় পরা, কাপড়ের খুঁট গায়ে জড়ানো স্বাস্থ্যবান এক ব্যক্তি। এই জীবনানন্দ দাশ, রাসবিহারী এভিনিউ-এর পথে অসংখ্যবার দেখেছি, কাপড়ের কোঁচা শক্ত হাতে ধরে আড়চোখে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে পথ চলেছেন। 'শতভিষা'-র জন্য কবিতা চাইতে বললেন, আর কে কে লিখছে? প্রেমেন লিখছে? আমি বললুম উনি তো কবিতা লেখেন না,গান লেখেন। শুনে দেড় মিনিট ধরে এক অলৌকিক হাসি হাসতে থাকলেন, সে হাসিতে সমস্ত শরীর কাপে, দাঁত দেখা যায় না। তারপর ঠিক এক সপ্তাহ পরেই দিয়েছিলেন। আমরা যতবার তার কাছে কবিতা চেয়েছি, কখনো ফেরাননি।"
বিষ্ণু দে নিয়মিত লিখেছেন শতভিষা'-য়।'প্রুফ দেখবার কঠোর নির্দেশ জানিয়ে বুদ্ধদেব বসুও কবিতা দিতেন নিয়মিত। লিখতেন 'পূর্বাশা' সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্য। সুদুর বস্টন থেকে কবিতা পাঠাতেন 'বাঙালিবাবু' অমিয় চক্রবর্তী। লিখতেন অজিত দত্ত।
শতভিষা'-র প্রত্যেক সংখ্যায় কবিতাগুচ্ছের পাশাপাশি থাকতো কবিতা বিষয়ক গদ্য, কবিতা গ্রন্থের সমালোচনা।
কখনো বিদেশি কবিতার পর্যালোচনা। গদ্যগুলি লিখতেন আলোক সরকার, তরুন মিত্র, দীপংকর দাসগুপ্ত, অলোকরঞ্জন দাসগুপ্ত, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত প্রমূখ। পূর্বসূরি অরুণ কুমার সরকারও শতভিষা-য় গদ্য লিখেছেন। 'শতভিষা' কখনো কোনো বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেনি। কেবল ২৫তম সংখ্যাটি (পৌষ ১৩৬৯) ছিল একটি গদ্য সংখ্যা। ততদিনে 'কৃত্তিবাস'-র ১৬ নম্বর সংকলন প্রকাশিত হয়েছে।'যৌনকাতর' ক্ষুধার্ত সেই সংখ্যার প্রতিক্রিয়ায় কবিতা কেমন হবে এ বিষয়ে শতভিষা-র দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করতে ২৯ তম সংখ্যার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এই সংখ্যায় তিনটি প্রবন্ধ ছাপা হয়--- অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের 'স্থির বিষয়ের দিকে' আলোক সরকারের 'শিকড় অভিলাষী চৈতন্য' এবং দীপংকর দাশগুপ্তের 'কবিতা: আধুনিক কবিতা'। ঘোষণা করা হয় যে, শতভিষা থেকে ৬টি প্রবন্ধের একটি সংকলন প্রকাশিত হবে 'কবিতার স্বাধিকার' নামে।এতে লিখবেন অরবিন্দ গুহ, অলোকরঞ্জন দাসগুপ্ত, আলোক সরকার, তরুন মিত্র, দীপংকর দাসগুপ্ত এবং শঙ্খ ঘোষ। সংকলনটি সম্ভবত আর প্রকাশিত হয়নি।
'শতভিষা' প্রকাশলগ্ন থেকেই ছিল বাহুল্যহীন। কোনরকম বিজ্ঞাপনিক উচ্চকণ্ঠ তার ছিল না। তাই নিজেদের উদ্যোগ-আয়োজনের অনুষ্ঠান, তার সংবাদ পরিবেশনেও তার ভাষা সংযত, বাহুল্যবর্জিত ও অবিজ্ঞাপনিক। শতভিষা'-র চেহারার মধ্যেও ছিল বাহুল্যহীনতার ছাপ।সমকালে 'কৃত্তিবাস' অঙ্গসৌষ্ঠবে ঝকঝকে, নিপূণ, তার প্রচ্ছদ রুপায়ন ও প্রকাশ পরিকল্পনা। পাশাপাশি 'শতভিষা'-র প্রচ্ছদপট আড়ম্বরহীন সাধারণ লিপিকরণ মাত্র। প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদ ছিল প্রেসের লেটারিং-এর ব্যবহার। তৃতীয় সংখ্যার প্রচ্ছদ করেন অজিত বক্সী। চতুর্থ সংখ্যা থেকে নবম সংখ্যা পর্যন্ত অশেষ চট্টোপাধ্যায় কৃত লেটারিং-এর ব্যবহার। ১০ম থেকে ১৭ পর্যন্ত প্রচ্ছদ লিপিকার মণীন্দ্র মিত্র। ১৮ থেকে ২৬ সংখ্যার প্রচ্ছদ শিল্পী সমীর রায়। ২৭ থেকে ৪০ পর্যন্ত প্রচ্ছদ শিল্পী সুবোধ দাশগুপ্ত।
১৩৫৮ শারদীয় সংকলন থেকে শুরু করে ১৩৭৯ চল্লিশতম সংখ্যা পর্যন্ত আলোক সরকারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। প্রথম দিকে 'শতভিষা'-য় সম্পাদকের নাম ছাপানো হতো না সম্পাদকের।২৪তম সংখ্যা পর্যন্ত (বৈশাখ ১৩৬৬) প্রকাশক হিসেবে নাম ছাপা হতো দীপংকর দাসগুপ্তের। ২৫তম সংখ্যা (অগ্রহায়ন,১৩৬৬) থেকে ২৮ নম্বরে আবার প্রকাশক দীপংকর দাসগুপ্ত। ৩১তম সংখ্যা (আষাঢ়,১৩৭১) পর্যন্ত প্রকাশক আলোক সরকার এবং ৩২তম সংখ্যা (মাঘ,১৩৭১) থেকে ৪০তম সংখ্যা পর্যন্ত প্রকাশক ও সম্পাদক হিসেবে তরুণ মিত্রের নাম।
১৯৫২ সাল থেকে ১৯৫৩ অবধি 'শতভিষা' নিয়মিত যথাসময়ে প্রকাশিত হত, বছরে চারটি সংখ্যা।১৯৫৩ থেকে বছরে দুটি এবং এরপরে অনিয়মিত প্রকাশ।১৯৬৪ সালের পর আরেকবার নতুন উদ্যমে শুরু করেন সম্পাদকত্রয়। কিন্তু আলোক সরকার জানিয়েছেন, ততদিনে তিনি ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত । পাশাপাশি 'কৃত্তিবাস' তখন কবিদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়। "তরুণ কবিদের উচ্ছ্বাস তখন কৃত্তিবাস-কে কেন্দ্র করে। 'শতভিষা' কোনদিনই সর্বসাধারণের পত্রিকা হতে চায়নি। জনপ্রিয়তাও তার আকাঙ্ক্ষা নয়। শতভিষা সম্পর্কে যারা আগ্রহী, তারা স্বীয় প্রচেষ্টায় পত্রিকা সংগ্রহ করবেন।" ১৯৬৭তে প্রকাশিত ৩৫তম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে এই কথাগুলি যে একটা ক্লান্তি, অবসাদ থেকে, একটা অভিমান থেকে লেখা হয়েছিল আলোক সরকার পরে তা স্বীকার করেছেন। মানস রায়চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে যথার্থই বলেন,
"কৃত্তিবাস বড় রাজপথের, শতভিষার রাস্তাটা নিঃসঙ্গ গলি--- সেখান দিয়ে মানুষ একটা হেঁটে যাচ্ছে--- এরকম একটা নিঃসঙ্গতার ব্যাপার শতভিষা'-র সর্বাঙ্গে ছিল।... 'শতভিষা' কিন্তু একটা বিশেষ স্বাদের, বিশেষ ভঙ্গির এবং বিশেষ আত্মআবিষ্কারের নমুনা তুলে ধরতে পেরেছে সর্বকালের কাছে, যতই শীর্ণ তার অস্তিত্ব হোক,যা সেই সময়কার কিছু সংখ্যক কবির কাছে এবং পরবর্তীকালেও খুব একটা কম আকর্ষণীয় ছিল না। যদিও 'কৃত্তিবাস' অনেক বেশি এবং অনেক উল্লেখযোগ্য কবির জন্ম দিয়েছে পরবর্তীকালে, সে হিসেবে 'শতভিষা' হয়তো তেমন আন্দোলন হয়ে ওঠেনি। অত মৃদু উচ্চারণ দিয়ে আর যাই হোক আন্দোলন তৈরি করা যায়না।"( 'নির্বেদ' সংকলন ২৫, অক্টোবর,১৯৮৬)। সত্যি অর্থে 'শতভিষা' শেষের দিকে ছিল অনিয়মিত, অল্প পরিসর,ফলে সব কবিদের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী হতে পারেনি। কোনরূপ অতিকথন ছিলনা।বিলি ব্যবস্থা ছিল দুর্বল। এসব কারণে প্রথমদিকে অনেক কবি যাঁরা শতভিষা-কে আশ্রয় করেছিলেন, তারা চলে যান অন্য প্লাটফর্মে।'শতভিষা'-র জন্মলগ্ন থেকেই আধুনিকতার বোধটিতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চেয়েছে। আধুনিকতাকে 'শতভিষা' দেখেছিল প্রবাহমানতা অর্থে।যা ব্যক্তিত্ব চিহ্নিত, নতুন-- তা-ই আধুনিক। এ বিষয়ে, শতভিষা'-র বক্তব্য ".... শতভিষা' প্রকাশের সময় আমরা আধুনিকতার প্রকৃত তাৎপর্যের কথা মনে রেখেছিলুম। আধুনিকতার অন্তর্লীন সত্য নির্মাণনিবেশী বিশ্লেষণী মন্ময়তা, কিন্তু দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে আধুনিকতা ক্রমঅগ্রসর- মানতার ধর্মে দীক্ষিত।…. কেবল সমস্ত প্রাচীনতাকে পরিহার করা যেমন নির্বুদ্ধিতা, সেই রকম সমসাময়িক কাল, সমসাময়িক শিল্পধারণা নিশ্চিতই প্রতিদ্বন্দ্বী এবং অনস্বীকার্য।"( শতভিষা, রজতজয়ন্তী সংখ্যা,১৩৮৩)। বুদ্ধদেব বসু-র 'অতিরিক্ত যৌনচেতনা' সমর সেনের নগরমনস্ক সপ্রতিভতা কিংবা জীবনানন্দ-বিষ্ণু দে-র কাব্য প্রতিন্যাস তাঁদের অপ্রয়োজনীয় ও বহুব্যবহারপীড়িত মনে হয়েছিল। শতভিষা'-র ৩৩ তম সম্পাদকীয়তে বলা হল,-- "সময়ের হাতে তিরিশের দশকের কবিদের ব্যবহৃত কৌশলগুলির দিন যে ফুরিয়ে গিয়েছে 'শতভিষা' তা উপলব্ধি করেছিল: তিরিশের দশকের কবিদের যৌনকাতরতা, মূল্যবোধে অনাস্থা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, অতিরিক্ত সমাজভাবনা, তরল কাব্যময়তা ইত্যাদি আপাত লক্ষণগুলি যে আর ব্যবহৃত হবার নয়, এ সত্য অভ্রান্ত জেনে বাংলা কবিতার মুক্তির জন্য 'শতভিষা' প্রয়োজন অনুভব করেছিল নতুন পথ সন্ধানের।"
'শতভিষা' যে নতুন কবিতাভাবনার কথা ভেবেছিল তাকে আলোক সরকার বলতে চেয়েছেন 'বিশুদ্ধ কবিতা' অর্থাৎ যা কিছু কবিতা নয় তাকে কবিতা থেকে বাদ দিতে হবে। এর আগের রাজনৈতিক আলোড়নে অস্থির ।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, দেশ বিভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা--- এসবের আলোড়নে বাংলা কবিতা তখন অতি চিৎকৃত, স্লোগানমুখর। এ পটভূমিতে 'শতভিষা'-র বিশুদ্ধ কবিতা ধারণা।
নিজেদের মধ্যে কোনরকম পরামর্শ ছাড়াই 'কৃত্তিবাসে'-র কবিরা লিখতেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষায় 'স্বীকারোক্তিমূলক কবিতা'। শতভিষার কবিরাও বিশেষ ধরনের কবিতা ভাবনায় তাড়িত হয়ে কবিতা লিখতেন এবং এ জন্য নিজেদের মধ্যে কোন যৌথ পরামর্শ ছিল না নিশ্চয়।
আলোক সরকার লিখেছেন, "পত্রিকা সম্পাদক কেন বলে দেবেন কীভাবে কবিতা লিখতে হবে। তবে বুদ্ধদেব বসু-র 'কবিতা' যেমন মূলত ছিল রবীন্দ্রপ্রভাব উত্তীর্ণ আত্মউজ্জীবিত কবিদের আসর, সেখানে জীবনানন্দ দাশের পাশাপাশি বিষ্ণু দে-র বসতে অসুবিধা হত না, আমাদের পত্রিকাও ছিল বিশুদ্ধ কবিতা অর্থাৎ অবিমিশ্র কবিতার ধর্মে দীক্ষিত।তা কোনোভাবেই পূর্বসূরীদের প্রভাবে জীর্ণ নয়।"কবিতার এই নতুন ধারার সঙ্গে পরিচিত হয়ে চল্লিশের কবিদের মনে হয়েছে, বাংলা কবিতার একটি স্বতন্ত্র ধারা প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালে বিশেষ শক্তি সঞ্চয় করে ইতিমধ্যেই বেশ কিছুদূর অগ্রসর হয়েছে। এই বক্তব্যের সূত্র ধরে অরুণ কুমার সরকার বলেছেন, 'বাংলা কবিতার একটি স্বতন্ত্র ধারা (শতভিষা-১৮) প্রবন্ধে জানান যে,'শতভিষা'-র কবিরা ত্রিশের কবিতার পুনরুক্তি যেমন করেননি, তেমনি চল্লিশের দশকের বিশৃঙ্খলা সংশয় যন্ত্রণার অপব্যয়িত সময়ের অনুরণনও ঘটাননি। যা স্বাভাবিক সহজ স্বচ্ছন্দে তাকে গ্রহণ করেছেন এই কবিরা। এঁদের কবিতা যেমন যৌনতার উল্লাস নয়, তেমনি নয় প্রচলিত শাস্ত্রশাসনও। সময়ের সহজ ছন্দকে এঁরা প্রত্যক্ষ করেছেন বলেই 'আধুনিক হবার প্রয়োজনে এদের কাউকে নালা-নর্দমায় স্নান করতে হয়নি, আশ্রয় নিতে হয়নি উপর চালাকির।'
সমকালের দুটি কবিতা পত্রিকা 'শতভিষা' ও 'কৃত্তিবাস'-এর লেখকগোষ্ঠী প্রায় একই ছিল। এই দুটি পত্রিকার মধ্যে বিরোধ কখনো দেখা যায়নি। কৃত্তিবাস-র পাতায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন তরুণ কবিরা একটার পরিবর্তে দুটি পত্রিকা পেয়েছিল আত্মপ্রকাশের জন্য। কিন্তু পঞ্চাশের দশকের শেষে ষাটের দশকের শুরুতে 'কৃত্তিবাস'-র ১৬নম্বর সংখ্যা প্রকাশিত হলে, 'কৃত্তিবাস' অর্জন করে একটি রাগী চেহারা। যৌনতা, পাপবোধ,নরকবিলাসের অতি প্রাদুর্ভাবে 'কৃত্তিবাস' হয়ে ওঠে 'ক্ষুধার্ত', 'কামার্ত' কবিতার সংকলন। 'শতভিষা' এই ব্যাপারটি সমর্থন করেনি। শতভিষা'-র মতে কৃত্তিবাস-র এই অতিরিক্ত জৈবিক প্রবণতা প্রকৃতপক্ষে ত্রিশের 'কল্লোল'-র ভাবনার দিকে মুখ ফেরানো। 'কৃত্তিবাস'-র ষোড়শ সংখ্যার প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত হয় 'শতভিষা'-র ২৯ সংখ্যক গদ্য সংখ্যাটি। সেখানে লিখলেন আলোক সরকার, অলোকরঞ্জন দাসগুপ্ত, দীপংকর দাসগুপ্ত। আলোক সরকারের প্রবন্ধে বলা হল, "অভ্যাসের আনুগত্যে আজকের দিনের কিছু কবি কবিতায় এখনো তথাকথিত অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করে আত্মতৃপ্তি অনুভব করেন,এমনকি সকল কবি এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে কামুক হয়ে ওঠেনি--- এই আক্ষেপ উচ্চারণ করছে এমন একাধিক কবিতা এক বছরের মধ্যেই প্রকাশিত হতে দেখেছি।…. যা কিছু প্রাকৃতিক সত্য, যেমন আমাদের যৌনকামনা, বস্ত্রের আড়ালে শরীর, সকল অর্জিত সংস্কৃতি-- সভ্যতার শাসনের ঊর্ধ্বে আমাদের হিংস্রলোলূপ স্বার্থপর কামুক প্রবণতাগুলির উচ্চারিত বিজ্ঞাপনিক তালিকা রচনায় উদ্বাস্তু।" অলোকরঞ্জন দাসগুপ্ত লিখলেন, "তখনই আক্ষেপ না করে উপায় থাকেনা যে ইতিহাস পুনরুক্ত হয় না জেনেও ঘড়ির কাঁটা কৃত্রিম আগ্রহে আবার পিছন ফিরিয়ে। বর্তমান কবিদের বড় একটি অংশ আবার বিগত প্রথম ও তৎপরবর্তী কবিতার কাছে, আধুনিকতার সহজ পাঠ নিতে উদগ্রীব হয়েছেন। সেই অনুগামিতার ফল এই স্বকপোলকল্পিত অবক্ষয়, সস্তা দেহাত্মবাদ, বিকারোক্তি প্রবণতা, অতিকথন, বাইরে থেকে বলা, কুড়িয়ে পাওয়া অপ্রেমে জীবাত্মাকে ঝালিয়ে নেওয়া এবং ক্লিশে নিঃস্ব আরো অগণিত ইত্যাদি।"
আজকের বাণিজ্যিক পত্রিকা অ-নির্ভর লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের যে সম্পন্ন চেহারা, তার অনেকটা সূচনা করেছিল 'শতভিষা'। 'শতভিষা'-র প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বেশ কয়েকটি কবিতার কাগজ প্রকাশিত হয়---রোহিন্দ্র চক্রবর্তীর 'কবিতাপত্র', সত্যেন্দ্র আচার্য, অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়ের 'সব শেষের কবিতা', ভূমেন্দ্র গুহরায়, স্নেহা ভট্টাচার্য, জগদিন্দ্র মন্ডলের 'ময়ূখ' এবং দুবছর পরেই 'কৃত্তিবাস'। পবিত্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত 'কবিপত্র' কাগজটি যে শতভিষা'-র অনুপ্রেরণার ফসল তা জানা যায় সম্পাদকের বক্তব্য থেকে(কবিপত্র-৪০)। এই কৃতিত্বের দাবি জানিয়ে 'শতভিষা'-র ৩৩ নম্বর সংকলনের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, 'একটি কথা ভেবে 'শতভিষা' বিশেষ গৌরব অনুভব করে। বাংলা সাহিত্যের আক্ষরিক অর্থে লিটল ম্যাগাজিনের ধারা 'শতভিষা'-র প্রবর্তন।
১৯৫১ সালে 'শতভিষা' যে ১৬ পাতার কবিতা পত্রিকা প্রকাশের শুরু করেছিল, তার ধারা বাংলা সাহিত্যে আজও অব্যাহত।১৯৫১-র পর থেকে বাংলা সাহিত্যে এই ধরনের ক্ষুদ্র পত্রিকা কত প্রকাশিত হয়েছে তার সংখ্যা নির্ণয় সহজ নয়। বাংলা সাহিত্যে এই ক্ষুদ্র পত্রিকাগুলির ভূমিকা অসামান্য। অল্প অর্থব্যয়ে ছোট ছোট কবিদের দল তাদের মুখপাত্র প্রকাশ করেছে এবং প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছে। তাদের আর অশিক্ষিত ব্যবসায়িক পত্রিকাগুলির মুখাপেক্ষী হবার প্রয়োজন নেই। 'শতভিষা'-র আনন্দ এইটুকু যে সে- ই প্রথম এই ধরনের পথের নির্দেশ দেয়।"
'শতভিষা'-র এই দাবি অসঙ্গত নয়। নির্দ্বিধায় এ কথা বলা যায় যে, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যের জগতে 'শতভিষা' প্রথম যথার্থ কবিতা পত্রিকা, আজকের সম্পন্ন লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের পথিকৃৎ।








Comments
Post a Comment